ইরান প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত তার সামরিক সক্ষমতা এবং ড্রোন উৎপাদন বাড়াচ্ছে
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময় ইরান ইতোমধ্যেই ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সাথে পরিচিত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) এই তথ্য জানিয়েছে। আরও চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, ইরানের সামরিক বাহিনী প্রাথমিকভাবে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক দ্রুত তাদের সামরিক শিল্প এবং ঘাঁটিগুলো পুনর্গঠন করছে।
গোয়েন্দা সূত্রের মতে, চলমান সংঘাতে ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, উৎক্ষেপক এবং প্রধান অস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদন ক্ষমতা ইরান পুনর্গঠন করছে। এর অর্থ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি বোমা হামলা পুনরায় শুরু করেন, তাহলেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের মিত্রদের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে থাকবে। একই সাথে, এই অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সামরিক শক্তি কতটা দুর্বল হয়েছে, সে সম্পর্কেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ৬ মাসের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে আসতে পারে
যদিও বিভিন্ন অস্ত্রের উপাদান তৈরির সময়সীমা ভিন্ন ভিন্ন হয়, একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন যে গোয়েন্দা অনুমান অনুযায়ী ইরান আগামী ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণ ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ফিরে পেতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক অস্ত্র পুনর্গঠনের জন্য দেওয়া সমস্ত সময়সীমা ইরানিরা অতিক্রম করেছে।” যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরান তার ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতার ঘাটতি পূরণের জন্য বিপুল সংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করতে পারে, যা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম।
নেপথ্যে কি রাশিয়া ও চীন রয়েছে?
একটি সূত্র জানিয়েছে যে, প্রত্যাশার চেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতি এবং রাশিয়া ও চীনের পরোক্ষ সমর্থনের কারণেই ইরান এত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। সূত্রটির মতে, সংঘাত চলাকালীন চীন ইরানকে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে, যা বর্তমানে মার্কিন অবরোধের কারণে কিছুটা সীমিত।
গত সপ্তাহে সিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানকে “ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির যন্ত্রাংশ” সরবরাহের জন্য চীনকে অভিযুক্ত করেন। তবে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পেন্টাগন এবং সেন্টকমের পরস্পরবিরোধী বিবৃতি
এদিকে, ইরানের এই পুনর্গঠন নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার, মার্কিন হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক শুনানিতে সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তির ৯০ শতাংশ ধ্বংস করে দিয়েছে, যা পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
তবে, সিএনএন জানিয়েছে যে সেন্টকম কমান্ডারের এই দাবি এবং গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে, মার্কিন হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তাদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে কেবল কয়েক মাস বিলম্বিত করেছে, কয়েক বছর নয়।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে এক বিবৃতিতে বলেন, “মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশে যেকোনো সময় ও যেকোনো স্থানে অভিযান চালানোর সমস্ত সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।”
অর্ধেক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক অক্ষত
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এখনও আগের চেয়ে অক্ষত রয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি ইরানিদেরকে মাটির নিচে বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা উৎক্ষেপকগুলো খুঁড়ে বের করার সুযোগ দিয়েছে। এছাড়াও, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনও সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। একই সময়ে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ, যা হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে পরিচিত, ধ্বংস করা হয়নি।
সামগ্রিকভাবে, মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, যুদ্ধটি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করলেও, তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারেনি এবং তেহরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাটিয়ে উঠছে।

