আন্তর্জাতিক

যেভাবে ইরান ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিষয়ে বিশ্বের ধারণা বদলে দিয়েছে

 

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান উন্নত সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করতে পারেনি। বিশেষ করে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তারা বড় ধরনের সংকটে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আধুনিক যুদ্ধবিমান ও সরঞ্জামের বড় অংশই অচল হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি ইরানকে বাধ্য করে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নের পথে হাঁটতে।
এই সময়েই ইরানি প্রকৌশলী, শিক্ষার্থী ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা খুব সাধারণ উপকরণ দিয়ে ছোট আকারের রিমোট নিয়ন্ত্রিত ড্রোন তৈরি শুরু করেন। শুরুতে এগুলো ছিল নজরদারির জন্য ব্যবহৃত—শত্রুপক্ষের অবস্থান ও গতিবিধি বোঝার কাজে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ড্রোনগুলোকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রে রূপ দেওয়া হয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই ইরান ড্রোনকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরিবর্তন ছিল—উচ্চ প্রযুক্তির ব্যয়বহুল অস্ত্রের পরিবর্তে কম খরচে বেশি সংখ্যক ড্রোন তৈরি করা। একটি ড্রোনের খরচ তুলনামূলক কম হলেও, সেটি প্রতিহত করতে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়। একসঙ্গে অনেক ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে ফেলা—এটাই হয়ে ওঠে ইরানের অন্যতম কৌশল।
এছাড়া, ড্রোনগুলো সাধারণত নিচু উচ্চতায় এবং ধীরগতিতে উড়ে, ফলে রাডারে শনাক্ত করা কঠিন হয়। একাধিক ড্রোন একসঙ্গে আক্রমণ করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে সবগুলো প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই কৌশলের কার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়, যখন ইরানি প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করা হয়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে—বিশেষ করে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলায়—এই প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত কৌশল, স্বল্প খরচে উৎপাদন এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের মাধ্যমে ইরান ড্রোন যুদ্ধকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এটি শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণও বদলে দিয়েছে।