আন্তর্জাতিক

ইন্টারপোলের ওয়ারেন্ট কমান্ডার ভাহিদি, ইরান যুদ্ধের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে ইরানের ওয়ারেন্টভুক্ত জেনারেল কমান্ডার আহমদ ভাহিদির আবির্ভাব ঘটেছে। তেহরানের পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তিনি মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর ভাহিদি আইআরজিসি-র প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে ইরানের যুদ্ধ কৌশলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হয়।
এই সামরিক কর্মকর্তা, যিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন, তিন দশক আগে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে প্রাণঘাতী বোমা হামলায় জড়িত থাকার জন্য ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আছেন। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে ইরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ বলেছেন যে, ভাহিদি প্রভাবশালী হলেও তিনি একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই অংশ মাত্র। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অবস্থান খুবই শক্তিশালী।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের ফলে ইরানের নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ভাহিদির নেতৃত্বে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। একই সাথে, ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় তেহরানের অবস্থান আগের চেয়ে আরও কঠোর ও দৃঢ় হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনে, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, সামরিক ঘাঁটি, নৌ জাহাজ ধ্বংস করা এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা করার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে, তেহরান তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। কারণ তেহরান বুঝতে পেরেছিল যে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজের মধ্য দিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ করেই চারদিক থেকে চাপের মুখে পড়েন।
চলমান যুদ্ধ থেকে ইরান যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তার আরেকটি স্পষ্ট প্রমাণ হলেন কমান্ডার আহমদ ভাহিদি। ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেছেন, “ভাহিদিকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।” তার মতে, ভাহিদি সেইসব নেতাদের মধ্যে একজন, যারা বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার যুদ্ধ চায়, তবে ইরান প্রস্তুত।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, “হয় চুক্তি হবে, না হয় হামলা হবে।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হুমকি উপেক্ষা করে ভাহিদি পাল্টা সতর্ক করেছেন যে, ইরানের ভূখণ্ডে যেকোনো নতুন হামলা আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। ইরানের গণমাধ্যমে উদ্ধৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “আপনারা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) বাস্তবে এক ভয়াবহ আঘাত পাবেন।”
যদিও ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রকাশ্য আলোচনায় বেশি সক্রিয়। তবে পর্দার আড়ালে কমান্ডার ভাহিদিই যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছেন। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বেশ কয়েক দফা শান্তি প্রস্তাব সত্ত্বেও তেহরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে ‘ছাড়’ দিতে রাজি নয়। ফলে, আলোচনায় অচলাবস্থা ভাঙেনি।
১৯৫৮ সালে ইরানের শিরাজ শহরে জন্মগ্রহণকারী ভাহিদি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের ক্ষমতা বা কাঠামোর অংশ। তিনি আইআরজিসি-র কুদস ফোর্সের প্রথম কমান্ডার ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
২০২২ সালে, মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ভাহিদির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটন অভিযোগ করে যে, তিনি হিজাব আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন এবং ভাহিদি বিক্ষোভকারীদের দমনেও সমর্থন দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে ভাহিদির ক্ষমতায় আরোহণ শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের লক্ষণই নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তুলেছে। বলা যেতে পারে যে, ভাহিদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। কারণ তার পূর্বসূরিদেরও হত্যা করা হয়েছিল। বিশেষ করে, অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়ায় কাসেম সোলেইমানিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে যে, কমান্ডারদের হত্যার মাধ্যমে ইরান নেতৃত্বের শূন্যতায় ভুগবে। তবে, ভাহিদির ক্ষেত্রে বিষয়টি সহজ হবে না। কারণ তিনি জনসমক্ষে আসেন না। ইরান তার অস্তিত্ব বা তিনি যে কোনো যুদ্ধ কৌশল পরিকল্পনা করছেন, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দেবে না।