জুলাইয়ের বীরদের খলনায়ক বানানোর চেষ্টা চলছে: সাদিক কায়েম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অনেক নেতা বাংলাদেশ থেকে চুরি করা শত শত কোটি ডলার নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আজ তারা সেই চুরি করা টাকা ব্যবহার করে বিদেশ থেকে জুলাই বিপ্লবকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে। তারা জুলাইয়ের বীরদের খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
আজ রবিবার (১৯ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘২য় জুলাই বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিজেআর-২ ২০২৬)’-এ বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার সময় তিনি এসব কথা বলেন। সাদিক কায়েম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে একটি স্বৈরাচারী শাসন আমাদের কণ্ঠরোধ করেছে এবং আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। আমরা খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। গত ১৬ বছর ধরে এই দেশ গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং অগণিত অমানবিক কর্মকাণ্ডে জর্জরিত। সেই অবিচার থেকেই জুলাই বিপ্লবের জন্ম।
তিনি আরও বলেন, তারা মনে করে যে তাদের প্রচারণা আমাদের সবকিছু ভুলিয়ে দেবে। তারা মনে করে যে মানুষ ভুলে যাবে যে তারা গত ১৫ বছরে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে, গুম করেছে, দেশের সম্পদ লুট করেছে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। কিন্তু আমরা তা কখনো ভুলব না।
ডাকসু-এর সহ-সভাপতি বলেন, এই জুলাই আন্দোলন নিপীড়ন, স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে আমরা মুক্ত, ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলাম। আর অবশেষে, এই জুলাই মাসে, যখন আমাদের অধিকার আক্রান্ত হলো, বাংলাদেশ আবার জেগে উঠল। সেই অর্থে, জুলাই বিপ্লব আমাদের দীর্ঘ ও গৌরবময় জাতীয় ঐতিহ্যের একটি অংশ।
তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংগ্রাম। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল; রিকশাচালক, ব্যবসায়ী, দিনমজুর, শ্রমিক, কৃষক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সকলের লক্ষ্য ছিল একটাই: নিজেদের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
সাদিক কায়েম বলেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর অসীম করুণায় বাংলাদেশের জনগণ স্বৈরাচারীকে পরাজিত করেছে। আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেয়েছি, আমাদের কণ্ঠস্বর ফিরে পেয়েছি এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। আর একারণেই বাংলাদেশের প্রত্যেক মুক্তিকামী নাগরিকের কাছে এটি কোনো দল, কোনো সংগঠন বা কোনো ব্যক্তির বিপ্লব ছিল না; এটি ছিল জনগণের বিপ্লব, এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের বিপ্লব।
বিপ্লবের পর রাতারাতি সবকিছু পূরণ হয় না উল্লেখ করে ডাকসু-এর সহ-সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ রাতারাতি ন্যায়বিচারের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠেনি। তাই কিছুটা হতাশা থাকা স্বাভাবিক। আমি আপনাদের অনেক উদ্বেগের সঙ্গে একমত, কিন্তু তা জুলাই বিপ্লবের গৌরবকে ম্লান করে না। জুলাই শুধু ৩৬ দিনের একটি আন্দোলন ছিল না। ওই ৩৬ দিন ছিল এক দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। জাতি হিসেবে ন্যায়বিচার, সংস্কার এবং আমাদের ক্ষত নিরাময়ের এই পথচলা দীর্ঘ। তাই আমাদের আশা হারানো চলবে না।
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন এমন সকলের প্রতি আমার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট: জুলাই আমাদের সকলের। এটা ছিল আমাদের বিপ্লব, এটা ছিল আমাদের আন্দোলন, এটা ছিল বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। এখন একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সময় নয়। এখন আমাদের অর্জনকে রক্ষা করার এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার সময়।”
তিনি আরও বলেন, “পতন হওয়া স্বৈরাচারী শাসন ও তার অনুচরেরা আমাদের রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমাদের জনগণ সাহস, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে যা অর্জন করেছে, তা আমরা তাদের কেড়ে নিতে দেব না। জুলাইয়ের সেই চেতনা আজও আমাদের ডাকে। এটি আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে, গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ডাকে। এটি আমাদের নিশ্চিত করতে ডাকে যে বাংলাদেশ যেন আর কখনও কোনো স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে না পড়ে।” শুধু কথায় নয়, কাজেও জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি বলেন, “আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি এবং সেই মুক্ত, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যার জন্য আমাদের দেশের মানুষ এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন।” সম্মেলনটি আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড থটস (আরআইটি), ইউনিভার্সিটি অফ রেজিনা (কানাডা), নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (সিঙ্গাপুর) এবং ইয়ুথ ফর বেটার ফিউচার সোসাইটি (ওয়াইবিএফ)।

