মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় এক মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান- সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
আগামীকাল মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ১০৮৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী । মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো কেবল ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়—বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিক নেতৃত্বের জীবন্ত প্রতীক। মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় তেমনই এক মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান, যার ১০৮৫ বছরের দীপ্তিময় পথচলা বিশ্বমানবতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।
৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিকভাবে ইসলামী শিক্ষা, গবেষণা ও চিন্তাচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিকশিত হয়েছে। এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাধারার এক সুদৃঢ় ভিত্তি। যুগে যুগে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক রূপান্তর ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আল-আজহার তার মৌলিক আদর্শ জ্ঞান, সহনশীলতা ও ন্যায় অটুট রেখেছে।
আল-আজহারের শিক্ষা-দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ওয়াসাতিয়্যাহ’—অর্থাৎ ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার আদর্শ। আল্লাহ তা’আলা কালামে পাকে ইরশাদ করেন: হে মুসলমানগণ, এভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উত্তম উম্মত বানিয়েছি। যেন তোমরা লোকদের জন্য সাক্ষী হও। আর (আমার এই অতীব সম্মানিত) রাসূল(সা:) তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন। (আল-বাক্বারাহ- ১৪৩)

এই দর্শন মানবসমাজকে চরমপন্থা ও বিভাজনের পরিবর্তে সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক সংলাপের পথে পরিচালিত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আল-আজহার থেকে শিক্ষালাভকারী অসংখ্য আলেম, ফকিহ, চিন্তাবিদ ও সংস্কারক বিশ্বব্যাপী জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন।
বর্তমান বিশ্ব যখন বিভক্তি, উগ্রবাদ ও মূল্যবোধের সংকটে পর্যুদস্ত, তখন আল-আজহারের ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মাননীয় গ্র্যান্ড ইমাম অধ্যাপক ড. আহমাদ মুহাম্মদ আহমাদ আত-তাইয়্যেব হাফিযাহুল্লাহ–এঁর দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বে আল-আযহার আজ বিশ্বমঞ্চে শান্তি, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক সহাবস্থানের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান এবং সভ্যতার মধ্যে সংলাপ জোরদারের উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আল-আজহারের সম্মানিত গ্রাজুয়েটসগণ শিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক নেতৃত্ব ও নৈতিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এ মহান প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। দ্য ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর আল-আজহার গ্র্যাজুয়েটস – বাংলাদেশ শাখার সভাপতি হিসেবে এই ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরে গর্বিত এবং আল-আজহারের সার্বজনীন বার্তা জ্ঞান, মানবিকতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা করি—তিনি যেন আল-আজহার শরীফকে কিয়ামত পর্যন্ত জ্ঞান ও হেদায়েতের আলোকবর্তিকা হিসেবে সমুন্নত রাখেন; এর নেতৃত্বকে শক্তি, প্রজ্ঞা ও তাওফিক দান করেন; এবং বিশ্ব মানবতার কল্যাণে এর অবদানকে আরও সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করেন। আল-আজহার দীর্ঘজীবী হোক। জ্ঞান, ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার এই মহিমান্বিত উত্তরাধিকার চির অম্লান থাকুক।

