আন্তর্জাতিক

লোহাগড় দুর্গ থেকে স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করল হবু বধূ

মহারাষ্ট্রের ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গ থেকে হবু বধূ কেতন আগরওয়ালকে তাঁর বাগদত্তা ধাক্কা দিয়ে হত্যা করেছেন। তবে, এই ঘটনার মাত্র চার দিন আগে সিয়া গোয়েল নামে এক তরুণী একই জায়গায় তাঁকে প্রথমবার হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়ালের দেওয়া একটি জবানবন্দি থেকে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
নিহতের বাবা বিশাল বর্ণনা করেছেন, কীভাবে সিয়া ১৪ জুন ২৬ বছর বয়সী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালকে প্রথমবার দুর্গ থেকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। সেই যাত্রায় একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে কেতন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এরপর, নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য, সিয়া ‘সাপ এসেছে’ বলে চিৎকার করে কেতনকে জড়িয়ে ধরেন।
বিশাল আগরওয়াল বলেন, ‘১৪ জুন ওরা দুজনে একা দুর্গে গিয়েছিল এবং সুযোগ বুঝে সিয়া কেতনকে ধাক্কা দেয়।’ ধাক্কা খাওয়ার পর একটি ঝোপ ধরে কেতন রক্ষা পায়। নিজের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে সিয়া ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করতে শুরু করে। তিনি আরও বলেন যে, এর আগে প্রাক-বিবাহ ভ্রমণে বালি যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর কেতনের পাসপোর্ট রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিল।
বিশাল আগরওয়াল বলেন, ‘এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর সবার কাছে পাসপোর্ট থাকলেও কেতনের পাসপোর্টটি ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তারা সেটি না পেয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ফেরার তিন-চার দিন পর সিয়া আবার কেতনের সঙ্গে তর্ক শুরু করে এবং তাকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেদ করতে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ১৪ই জুন সিয়া তাকে লোহাগড়ে নিয়ে যায়। সেখানে তারা একাই ছিল। সিয়া যখন কেতনকে ধাক্কা দেয়, তখন সে পিছলে যায়, কিন্তু একটি ঝোপ ধরে বেঁচে যায়। কেতনের জ্ঞান ফিরলে সে বুঝতে পারে যে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল এবং সে বেঁচে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিয়া সঙ্গে সঙ্গে ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করতে করতে তাকে জড়িয়ে ধরে।’ দুর্ঘটনা হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হলো।
পুনে জেলার গাহুঞ্জের বাসিন্দা এবং পারিবারিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পরিচালক কেতন আগরওয়াল গত ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গের কাছে ৪০০ ফুট গভীর একটি খাদে পড়ে যান। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই দুর্গটি মহারাষ্ট্রের ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম।
প্রাথমিকভাবে, মৃত্যুটিকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সিয়া লোনাভালা গ্রাম পুলিশকে জানিয়েছিল যে, প্রবল বাতাসের কারণে কেতন পা পিছলে খাদে পড়ে গিয়েছিল। এরপর পুলিশ একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করে। তবে, পরে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তদন্ত করার পর পুলিশের সন্দেহ হয়।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন), পুলিশ সিয়া গোয়েল এবং তার কথিত প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীকে (২২) হত্যা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। সিয়া নিজের একটি বেকারি চালাত এবং কোন্ধওয়ার বাসিন্দা চেতনের একটি শুকনো ফল তৈরির কোম্পানি ছিল। ব্যবসায়িক সূত্রের মাধ্যমেই তাদের পরিচয় হয়েছিল।
পুনে গ্রামের পুলিশ সুপার সন্দীপ সিং গিল বলেছেন যে, আর্থিক বিরোধ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কসহ একাধিক দিক বিবেচনা করে তদন্ত করা হয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, সিয়া চেতনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিল এবং কেতনকে তাদের পথের কাঁটা হিসেবে দেখত।
পুলিশের মতে, তারা দুজনে মিলে কেতনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। সিয়া বেড়াতে যাওয়ার অজুহাতে কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যায় এবং পরে চেতনকেও সেখানে ডাকা হয়। এরপর তারা দুজনে মিলে কেতনকে দুর্গ থেকে ফেলে দেয়।
স্থানীয় অপরাধ শাখা প্রথমে সন্দেহের ভিত্তিতে চেতনকে হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় চেতন পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাদের দুজনকেই সাত দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে। পুলিশ সুপার গিল বলেন, “কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়ালের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে লোনাভালা গ্রাম পুলিশ গতকাল ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় হত্যা এবং ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে।”
উল্লেখ্য যে, কেতন ও সিয়ার এই বছরের শেষের দিকে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। উভয় পরিবারই বিয়ের জন্য বড়সড় প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার মধ্যে রাজস্থানের উদয়পুরে একটি রাজকীয় প্রাসাদ বুক করাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তার আগেই এই তরুণ ব্যবসায়ীকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো।

সূত্র: এনডিটিভি