অর্থনীতি

তারেক রহমানের সরকারের প্রথম বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে যে বিষয়গুলো

দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় এসে বর্তমান বিএনপি সরকার একটি দুর্বল, চাপের মধ্যে থাকা ও সমস্যা জর্জরিত অর্থনীতি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলটি আজ সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। জানা গেছে, বাজেটে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের এটি হবে প্রথম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে এ বছরের বাজেট দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বস্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন করা যায় তা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা।
এছাড়াও, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একটি বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মূল্যের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ সামলানোও এই বাজেটে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বিভাগে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রস্তাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর থেকে ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত উৎস থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মাইনাস দুই শতাংশ, মূলধনী সরঞ্জাম আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ ঋণাত্মক—এমন অনেক পুঞ্জীভূত সমস্যার মধ্যে বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এগুলো পুনরুদ্ধার করে স্থিতিশীলতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আবার, বিএনপি নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বাজেটে সেগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তবে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে, বিনিয়োগ বাড়িয়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে জনজীবনে স্বস্তি আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি অর্থবছরে অর্জিত রাজস্বের চেয়ে এবারের বাজেটে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। আবারও বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। এটি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত ঋণ এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হবে।
বাজেটে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ আদায়ের পরিকল্পনা করেছে। মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই রাজস্ব আদায় কীভাবে করা হবে তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের সুদ বর্তমানে ব্যয়ের শীর্ষে রয়েছে। ফলে, বিএনপি সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে ঘাটতি বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি ঋণের ঝুঁকিতে পড়বে।
তিনি বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি অবশ্যই কমাতে হবে। এর জন্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বেতন স্কেল, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নতুন উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আবার, এই সবকিছুর জন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সেটা অতিরিক্ত কর আরোপ করে করা হবে, নাকি নতুন কোনো ধারণা নিয়ে আসা হবে, সেদিকেও সবার নজর থাকবে। এদিকে, এবারের বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলের জন্য ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২,০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বিএসএস-এর মতে, সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও করতে পারে। লাইসেন্স, অনুমোদন এবং কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি সরকার ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
অর্থ দপ্তর জানিয়েছে যে এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা-সংক্রান্ত পরিষেবা পাওয়া যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আজকের বাজেটে অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির প্রস্তাব আনা হতে পারে।
এছাড়াও, দেশের ২৫ লক্ষ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ বাজেটে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত হতে পারে এবং বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে।
তবে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারকে বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, তার চাপ সামলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার বাজেটে কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার বিষয়।
এছাড়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এই ঋণ পরিশোধে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়াতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেও অনেকে নজর রাখবে।