আহলে বায়তের মহব্বত না থাকলে সে অন্তর মরুভূমি: ধর্ম উপদেষ্টা
সাম্য, সুবিচার, মানবিক মর্যাদা সমুন্নত করে অপরাধমুক্ত ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসার এবং এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহবান জানানোর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জমিয়তুল ফালাহ মসজিদে ৪০তম ১০ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক শাহদাতে কারবালা মাহফিল শেষ হয়েছে। শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের আয়োজনে ৬ জুলাই রবিবার শেষ দিনের মাহফিলে হাজারো দ্বীনদার জনতার ঢল নামে। মসজিদ কমপ্লেক্সের নিচ তলায় পর্দাসহকারে বিপুলসংখ্যক মহিলাও বক্তাদের আলোচনা শুনেন। মাহফিলে বক্তারা নবী দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইনের (রা) ত্যাগ, বীরত্ব ও সাহসিকতার আদর্শ ধারণ করে যুবসমাজের উজ্জীবন এবং যুদ্ধ সংঘাত সহিংসতামুক্ত মানবিক বিশ্ব গড়ার আহ্বান জানান। শেষ দিনের মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও চেয়ারম্যান এবং পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা অধ্যপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, আহলে বায়তের মহব্বত না থাকলে সে অন্তর মরুভূমি। পৃথিবীতে আর কোনো পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের আবির্ভাব যাতে না ঘটে সেদিকে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমাদের মতের মধ্যে ভিন্নতা থাকতে পারে।কিন্তু আমাদের স্রষ্টা এক তথা আল্লাহ পাক। হযরত মুহাম্মদ (দ) আমাদের প্রিয় নবী (দ)। আহলে বায়তে রাসূল (দ) আমাদের চেতনা ও আদর্শের প্রতীক। ধর্মউপদেষ্টা বলেন, পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের অন্তরে আহলে বায়তে রাসুলের (দ) ইশক ভালোবাসা ও মহব্বত বিদ্যমান। এই মহব্বতই আমাদের নাজাতের উসিলা হবে নিঃসন্দেহে। ধর্ম উপদেষ্টা আরো বলেন, দেড় হাজার বছর ধরে কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা স্মরণ করে মুসলিম উম্মাহর রক্তক্ষরণ ঘটেছে। দেড় হাজার বছর ধরে একজন পিতামাতাও নিজেদের সন্তানের নাম ইয়াজিদ রাখেনি। অথচ লাখো কোটি মুসলমানের নাম হাসান ও হোসাইন। আমার নিজের নামও হোসাইন। এই নামের জন্য আমি নিজেকে গর্ববোধ করি। আহলে বায়তে রাসূলের (দ) চেহারার মধ্যেও নূর বা জ্যোতি বিদ্যমান। তাঁদের শান মর্যাদা অনেক উঁচুতে। ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের উন্নয়নে বর্তমান অন্তর্বতী সরকারও খুবই আন্তরিক। আগামীদিনে কীভাবে এই মসজিদের আরো উন্নয়ন করা যায় আমরা বিবেচনা করে দেখবো। মাহফিলে অতিথি ছিলেন, বীরমুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ একরামুল করিম। তিনি জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের উন্নয়নে ধর্ম উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, খুবই দুর্ভাগ্য যে গত ১৭ বছরে এই মসজিদে ১৭টি ইটও বসানো হয়নি। মসজিদের ওযুখানা ও শৌচাগারের অবস্থা খুবই খারাপ। আজ হতে বহু বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক টাকার বিনিময়ে এই মসজিদের জন্য জায়গা দিয়েছিলেন-তা হয়তো আমরা অনেকেই জানিনা। প্রয়াত নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান এই মসজিদের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। এই মসজিদ কমপ্লেক্সকে চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের মসজিদ বলে তিনি উল্লেখ করেন। সভাপতির বক্তব্যে আলহাজ¦ সুফি মিজানুর রহমান বলেন, দুঃখের পরই সুখ আসে এটাই আল্লাহর বিধান ও হুকুম। কঠিন বিপদ ও প্রতিকূলতার মাঝেও ইমাম হোসাইন (রা), নবী পরিবার তথা আহলে বায়তে রাসূল (দ) আজান ইকামতসহ জামাতের সঙ্গে নিজেদের তাঁবুতে নামাজ পড়েছেন। কঠিন বিপদেও নামাজ পরিত্যা ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, বিপদে ধৈর্যধারণ, তকদিরের ভালো মন্দ বিশ্বাস রাখা এটাই শাহাদাতে কারবাগ না করা, সর্বাবস্থায় সত্য ওলার দর্শন এবং হযরত ইমাম হোসাইনের (রা) শিক্ষা। সুফি মিজানুর রহমান আরো বলেন, প্রিয় নবী (দ) বলেছেন, আমার পুণ্যাত্না সাহাবাদের যে গালমন্দ করে তার ওপর আমি অভিসম্পাত করি। অন্যদিকে আল্লাহ পাক বলেছেন, আউলিয়ায়ে কেরামের যে বিরুদ্ধাচরণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আজ হতে চল্লিশ বছর আগে খতিবে বাঙাল আল্লামা জালাল উদ্দিন আলকাদেরী (রহ) এই আন্তর্জাতিক শাহাদাতে কারবালা মাহফিল প্রবর্তন করে গেছেন। এজন্য তিনি যুগে যুগে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই মাহফিলে যারা প্রতিদিন এসে এর শোভা বাড়াছেন এই মাহফিলই হতে পারে আমাদের জন্য দুনিয়া আখিরাতে সাফল্য ও নাজাতের উসিলা। আহলে বায়তের স্মরণে কারবালা মাহফিল আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে আলোচনা করেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান শায়খুল হাদীস আল্লামা কাযী মঈন উদ্দিন আশরাফি। তিনি বলেন, ইমাম হোসাইন ও আহলে বায়তে রাসুলকে (দ) ভালোবাসা এবং ইয়াজিদকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করাই ঈমানের পরিচায়ক। আহলে বায়তে রাসূলের প্রতি ইমাম চতুষ্টয়ের প্রেম বিষয়ে আলোচনা করেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস আল্লামা মুহাম্মদ আবুল হাসনাত। তিনি বলেন, ইমাম আবু হানিফা (রা) সহ সকল মাযহাবের ইমামগণ আহলে বায়তে রাসুলকে অসীম মহব্বত ভালোবাসা দেখিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ধন্যবাদ বক্তব্য দেন জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব আল্লামা সৈয়দ আবু তালেব মুহাম্মদ আলাউদ্দীন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন মাহফিলের প্রধান সমন্বয়ক পিএইচপি ফ্যামিলির ফিন্যান্স ডাইরেক্টর আলহাজ¦মুহাম্মদ আলী হোসেন সোহাগ চৌধুরী। তিনি বলেন, ১০ দিন ধরে অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে যারা মাহফিলে অংশগ্রহণ করে এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছেন সকলের প্রতি আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। মাহফিল আয়োজনের কোনো পর্যায়ে আমাদের ভুল বিচ্যুতি হয়ে থাকলে আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আগামী বছরগুলোতেও যাতে আমরা সুন্দরভাবে মাহফিল আয়োজন করতে পারি এজন্য সবার দোয়া চাই। তিনি মাহফিলের আয়োজকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। স্বাগত বক্তব্য দেন শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের সেক্রেটারি জেনারেল প্রফেসর কামাল উদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সনে ৪০ বছর আগে এই জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই শাহাদাতে কারবালা মাহফিলের বয়সও ৪০ বছর। এই মাহফিলের প্রবর্তনের কারণে খতিবে বাঙাল আল্লামা জালাল উদ্দীন আলকাদেরী (রহ) অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই মাহফিলের জন্য উদার পৃষ্ঠপোষকতাকারী আলহাজ¦ সুফি মিজানুর রহমানসহ আয়োজক, নানাভাবে সহযোগিতাকারী এবং প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা শ্রোতাদের প্রতি তিনি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অতিথি ছিলেন, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান প্রফেসর আবুল মহসিন মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, দরবারে ইছাপুরীর শাহজাদা সৈয়দ শফিউল আজম, রাউজান দারুল ইসলাম কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা শিব্বির আহমদ ওসমানি। পরিচালনা পর্ষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলহাজ¦ দিলশাদ আহমেদের নির্মিত বিগত দিনের চমৎকার একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি মাহফিলে পরিবেশিত হয়। কোরআন মজিদ থেকে তেলাওয়াত করেন কারী এরশাদ উল্লাহ ও নাতে রাসূল (দ) পরিবেশন করেন শায়ের মহিউদ্দীন তানভীর ও শায়ের মনির উদ্দিন কাদেরী। ড. জাফর উল্লাহ ও মাওলানা আহমদুল হক-এর সঞ্চালনায় মাহফিলে শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের কর্মকর্তা ও সদস্যগণের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ¦ খোরশেদুর রহমান, আলহাজ¦ মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, মুহাম্মদ সাইফুদ্দীন, প্রফেসর কামাল উদ্দীন আহমদ, আব্দুল হাই মাসুম, আলহাজ¦ দিলশাদ আহমেদ, আল্লামা আবুল হাশেম শাহ, হাফেজ ছালামত উল্লাহ, জাফর আহমদ সওদাগর, মনসুর সিকদার, সৈয়দ সম্রার্ট আহমদ ফতেপুরী, মাওলানা কাযী জালাল উদ্দীন, মাওলানা আবু সাঈদ মুহাম্মদ হামেদ, মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম, আ ব ম খোরশিদ আলম খান, মাইনুদ্দীন মিঠু, শফিক আহমদ, খোরশেদ আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ নাজিব আশরাফ, জহির উদ্দিন, সাজ্জাদ, গোলাম মোস্তফা, মুসা খান, শাহাবুদ্দিন, মোহম্মদ ফিরোজ, মোহম্মদ রুবায়েদ, সরফুদ্দিন জংগি, সহ বিভিন্ন দরবারের সাজ্জাদানশীন, মোতোয়াল্লী ও ইমামগণ। সালাত সালাম শেষে দেশ ও বিশ্ববাসীর শান্তি সমৃদ্ধি এবং ফিলিস্তিনিসহ বিশ্বের মজলুম মুসলমানদের নাজাত কামনায় মোনাজাত করেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল আলীম রেজভী।