অভিমত

হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (র.) ৭১৬তম ওরশ মোবারক

লেখক: সূফী ডা. মোঃ সুরায়েত রহমান ট্রাস্টি মেম্বার, হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (র.) দরগাহ ওয়াকফ এস্টেট

মানব ও জ্বীন জাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা যেসকল মহান ওলী-আউলিয়াকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.)। পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর নির্দেশে ১২ আউলিয়ার একটি দল ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সর্বজনীন শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে দিল্লী বিহার হয়ে আমাদের এই বাংলাদেশে নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুরে (বর্তমান লক্ষীপুর) আসেন। এই ১২ আউলিয়ার অন্যতম প্রধান হলো হযরত সৈয়্যদ আব্দুল কুদ্দুস ওরফে শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.), যিনি বড় পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর পৌত্র (নাতি)। তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে ১২০৮ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১৫ হিজরীর ২রা রজব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত সৈয়দ আজাল্লাহ্ শাহ্ ওরফে আব্দুল ওয়াহাব জিলানী (রহ.)।

বর্তমান লক্ষীপুর জেলার কাঞ্চনপুর ও শ্যামপুরে তাঁরা ইসলাম প্রচারের জন্য দু’টি খানকাহ স্থাপন করেন। নোয়াখালীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর বড় ভাই হযরত সৈয়্যদ আহম্মেদ তন্নরী ওরফে শাহ্ মিরান (রহ.) সহ তাঁর বড় বোন মজজুবা বিবি (রহ.) ওরফে সৈয়্যদা সালেহা বিবি (রহ.) সেখানেই থেকে যান। সেখানে তাঁদের মাজার শরীফ রয়েছে। প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর তাঁদের ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।

নোয়াখালীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর ১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) তাঁর চারজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে মেঘনা, যমুনা ও পদ্মা নদী পথে কুমীরের পিঠে আসীন হয়ে মহাকালগড় (রাজশাহী) এর উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি রাজশাহী শহর হতে ২৬ মাইল দূরে বাঘা থানার বড় বাঘা নামক স্থানে খানকাহ্ স্থাপন করেন এবং ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। পরে সেই এলাকার নামকরণ করা হয় মখদুম নগর।

উল্লেখ্য, তৎকালে পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) ইরাকের বাগদাদ শরীফ থেকে শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে দেশ দেশান্তরে অনেক বুজুর্গ আল্লাহ’ওয়ালাদেরকে প্রেরণ করতেন। রামপুর বোয়ালিয়া (বর্তমান দরগাহ্ পাড়া) তৎকালীন দেও ধর্মাবলম্বীদের প্রধান তীর্থস্থান ছিল। তাদের ধর্ম মতে দেবতাকে খুশি করার জন্য  প্রতিবছর নির্ধারিত দিনে নরবলি দেওয়া হতো। দেওরাজদ্বয় যাদুমন্ত্র দ্বারা বেশকিছু অসাধ্য সাধন করে যেন নিজেরাই অনেকাংশে ঈশ্বর নয়তো ঈশ্বরের অবতার বনে গিয়েছিল। কয়েকজন মুসলিম দরবেশ অত্র অঞ্চলে আসলে দেওরাজ তাঁদেরকেও শহিদ করে। ঐ সংবাদ বাগদাদ শরীফে পৌঁছালে পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর দপ্তর হতে হযরত তুরকান শাহ্ (রহ.) কে এই রাজশাহীতে শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচারার্থে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু নামাযরত অবস্থায় দেওরাজ তাঁকেও শহিদ করে। দেওরাজদ্বয় কর্তৃক রাজশাহীর প্রথম ইসলাম প্রচারক হযরত তুরকান শাহ্ (রহ.) শহিদ হওয়ার সংবাদে এবং এদেশে যেসকল মুসলমান ও সভ্য হিন্দুগণ স্থানে স্থানে বাস করছিল তাদের প্রতি দেও ধর্মাবলম্বীদের বর্বরতা চরমে পৌঁছালে এবং নরবলির মতো জঘন্য প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.), হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) কে মহাকালগড়ে (রাজশাহী) প্রেরণ করেন। তান্ত্রিক দেওরাজাদের শাসিত মহাকালগড় বা রাজশাহীতে ধর্মের নামে নরবলি দেওয়ার যে প্রথা চলমান ছিল তা কোনো ধর্মের বিধান হতে পারে না। তাই পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর নির্দেশে নরবলি প্রথা বন্ধের লক্ষ্যে মখদুম নগর (বর্তমান বাঘা) আস্তানা হতে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) তাঁর শিষ্যদের সহ মহাকালগড় এর তান্ত্রিক দেওরাজাদের বিরুদ্ধে তিনটি যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

যুদ্ধ শুরুর পূর্ব হতেই মখদুম বাবার অনেক কারামত মানুষজন প্রত্যেক্ষ করতে থাকে। যেমন রামপুর বোয়ালিয়ার জনৈক নাপিত পরিবারের ৩জন পুত্র ক্রমে ২জন নরবলি হয়ে গরীব নাপিতের অবশিষ্ট পুত্রটি বলি দেওয়ার কথা সিদ্ধান্ত হওয়ায় ঐ নাপিত গুপ্তভাবে মখদুম নগরে উপস্থিত হয়ে মখদুম বাবার নিকট নালিশ করে। বাবা মখদুম (রহ.) বলেন, যাও তোমার সন্তানসহ নদীর ধারে অবস্থান করবে, সেখানে আমার সাক্ষাৎ পাবে। নাপিত দম্পতি ঐ সন্তানসহ দিবারাত্রি নদীর ধারে কেঁদে কেঁদে বেড়াতে থাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত মখদুম বাবার সাক্ষাৎ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। বলি হবার পূর্ব রাতে নাপিত দম্পতি সন্তান সহ একসঙ্গে পানির মধ্যে ডুবে মরবে বলে পানিতে নামতেছে, এমন সময় পদ্মাগর্ভে “ভয় নাই, ভয় নাই” রবে কুমিরের পিঠে চড়ে মখদুম বাবা অসাধারণ রূপ ধারণে নাপিত দম্পতির নিকট আবির্ভূত হলেন। ভয়ে বিহ্বল দম্পতিকে অভয় প্রদানে তার পুত্রের গলদেশে হাত মোবারক বুলিয়ে দিলেন এবং ফুঁ দিয়ে বললেন ভয় নাই, চলে যাও। নাপিত বলে হে দেবতা, মুসলমান রাজা এখানে অপেক্ষা করতে বলেছেন। মখদুম বাবা বললেন, সে-ই আমি, রাজাও নয় দেবতাও নয়, আমি মখদুম। শীঘ্রই তোমাদের দেওরাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাকে পুনর্বার দেখতে পাবে। ভয় নাই তোমার পুত্র বলি হবে না। কোনো কথা প্রকাশ করো না বলে কুমিরের পিঠে চড়ে অন্তর্ধান হলেন। সকাল বেলায় মহাকাল দেও মন্দিরে নাপিত পুত্রকে বলি দেওয়ার জন্য আনা হলো। কিন্তু খাঁড়ার ঘাত প্রতিঘাতেও তাঁর গর্দান কাটা সম্ভব হলো না। নাপিত পুত্র কোনরূপ কষ্টবোধও করলো না। মহাকাল প্রতিমা পড়ে যাবার মতো হালতে দুলতে লাগলো। দেওরাজের নিকট সেই খবর পৌঁছালে ঐ নরে দোষ আছে বলে নাপিত পুত্রকে ছেড়ে দেওয়া হলো। সন্তান বেঁচে যাওয়ায় এই ঘটনায় নাপিত দম্পতির মনেপ্রাণে মখদুম নাম ধ্যান হলো।

মখদুম বাবার মাজারের পাশে যে পুকুরটি আছে সেটি ছিল দেওরাজাদের যাদুর কূপ বা যাদুকুণ্ড। দেওরাজদ্বয় ১ম ও ২য় যুদ্ধে তাদের যেসকল সৈন্য নিহত হতো তাদেরকে এই যাদুর কূপে ফেলে দিলে তারা পুনরায় জীবিত হতো। এটা বুঝতে পেরে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) আধ্যাত্মিক শক্তি বলে দেওরাজার যাদুকুণ্ড ধ্বংস করেন। বহু দরবেশ ও মালাং ফকির সহ দানবকূল ধ্বংস করার জন্য ৩য় বা শেষ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের ফলাফল তান্ত্রিক দেওরাজাদের পক্ষে চলে যেতে লাগলে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) তাঁর পায়ের একটি খড়ম রাজ সৈনিকদের দিকে ছুড়ে মারেন এবং অলৌকিকভাবে ‘হু’ ‘হু’ হুঙ্কার রবে ঘূর্ণায়মান খড়মের আঘাতে দেওরাজার দুই ছেলের মৃত্যুসহ অন্য সৈন্যরাও ধরাশায়ী হতে থাকে এবং যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত হয়। দেওরাজদ্বয় রাজ পরিবার-পরিজনসহ মৃত পুত্রদ্বয়ের লাশ নিয়ে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর সামনে তাঁর পায়ের উপরে পড়ে পুত্রদ্বয়ের প্রাণ ভিক্ষা চায়। দয়ার সাগর মুশকিল কুশা হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) মৃত লাশদ্বয়ের হাত ধরে বলেন “ঘুমাও মাত উঠ”। মৃত পুত্রদ্বয় জীবিত হয়ে উঠে বসলো। দেওরাজদ্বয় সপরিবারে ঈমান এনে মুসলমান হলো। এটা দেখে এবং শুনে ক্রমেই বিস্তর দেওধর্মাবলম্বী মুসলমান হলো ও কিছু সভ্য হিন্দু সমাজে দলভুক্ত হলো। এ বিজয়স্মৃতি রক্ষার্থে হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) মখদুম নগরে (বর্তমান বাঘা) একটি সুদৃশ্য বিজয় তোরণ নির্মাণ করেন।

গৌড় নগরের বাদশাহ হোসেন শাহের পুত্র নছরত শাহ দেশ পর্যটন কালে এই বিখ্যাত মখদুম নগরে (বাঘা) উঠে সমস্ত শুনে একটি দীঘি ও কারুকার্যখচিত প্রকাণ্ড বিখ্যাত মসজিদ ৯৩০ হিজরীতে (১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দ) নির্মাণ করে দেন। তৎপর দিল্লীর বাদশাহ জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহান তার পরিভ্রমণ কালে বিখ্যাত মখদুম নগরে উঠেন এবং ঐ মসজিদ ও দরগাহর আদিকীর্তি রক্ষার্থে ধর্ম কার্যের জন্য জায়গীর হিসাবে ৪২ খানা মৌজা হুকুম দেন এবং ১০৩৩ হিজরীতে (১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) তা দান করেন যা বর্তমান বাঘায় অবস্থিত।

২৭ রজব ৭৩১ হিজরী (১৩৩১ খ্রিষ্টাব্দ) হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) ওফাত লাভ করেন। হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর ওসিয়ত অনুযায়ী তাঁর ওফাতের প্রায় ২৫০ বছর পর তাঁর ছোট ভাই হযরত সৈয়্যদ মনির উদ্দীন আহম্মেদ (রহ.) এঁর বংশের সন্তান হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) বাগদাদ থেকে রাজশাহী আসেন এবং খেলাফত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এই শাহ্ নূর বাবাই ছিলেন বাঘার বিখ্যাত কুতুবুল আখতাব হযরত আব্দুল হামীদ দানিশমন্দ (রহ.) এঁর আধ্যাত্মিক গুরু।

হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) ইরাকের বাগদাদ শহরে ১৪৭৫ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৮৭৫ হিজরীর ১২ই রজব জন্মগ্রহণ করেন। বুজুর্গি হাসিল করে তিনি সপরিবারে বাগদাদ শরীফে বাস করতেন এবং পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর দরবারের গদিনশীন হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। একদিন রাত্রিতে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) দর্শন দিয়ে বলেন, প্রিয় নূর, আমার দক্ষিণাঙ্গ, তুমি বাঙ্গালা দেশে রামপুর বোয়ালিয়ার মোকামে আমার স্থানে আমার খলিফা পদে নিযুক্ত রয়েছো ও ভেদ বাক্যাদি ওসিয়ত দান করে আদেশ করলেন সেথায় তোমার সপরিবারে চিরকালের স্থান নির্ধারিত হয়েছে। কিছুদিন পরে একদিন রাত্রিতে ধ্যানযোগে পুনরায় পীরানে পীর দস্তগীর গাওসুল আযম বড়পীর হযরত সৈয়্যদ আব্দুল ক্বাদের জিলানী (রহ.) এঁর জ্যোতি আর্বিভূত হয়ে আদেশ হচ্ছে প্রিয় নূর যাও তোমার নির্ধারিত স্থান বাঙ্গালায় রামপুর বোয়ালিয়ায় যাও, সেথায় যাবার সুব্যবস্থার পথ শীঘ্রই তোমার সম্মুখে উপস্থিত হচ্ছে তুমি প্রস্তুত থাকবে। ঐ আদেশ প্রদান করে জ্যোতি অন্তর্ধান হয়।

এর কিছুদিনের মধ্যে রাজ্যচ্যূত বাদশাহ হুমায়ন বাগদাদ শরীফের পাক গদীতে উপস্থিত হয়ে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর নিকট এই মর্মে ওয়াদা করলেন যে, যদি তিনি পুনরায় দিল্লীর বাদশাহী লাভ করেন তাহলে নজরানা হিসাবে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর নামে মহাকালগড়ে (রাজশাহী) আড়াই হাজার বিঘা লা-খিরাজ সম্পত্তি প্রদান করবেন। হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং আল্লাহুর রহমতে বাদশাহ হুমায়ন পুনরায় দিল্লীর বাদশাহী লাভ করলেন। দিল্লীর সিংহাসন লাভ করে ৯৬২ হিজরীতে আড়াই হাজার বিঘা নজরাৎ মদতমাস সম্পত্তির (কোনো বিদ্যান মুসলমান গুণী ব্যক্তির গুণের স্বীকৃতি স্বরূপ বংশানুক্রমিক ভোগ দখলের নিমিত্ত প্রদত্ত লা-খিরাজ সম্পত্তি) আদেশ প্রদান করলেন। কিন্তু ভুলবসত আড়াইশ বিঘা সনদ ফরমান আগত হলে শাহ্ নূর বাবা তা ফেরত পাঠালেন। বাদশাহী হুকম রদ রহিত নীতিবিরুদ্ধ উল্লেখ করে বাদশাহ হুমায়ন প্রতি উত্তরে অতি আজিজির সহিত উক্ত ফরমান সনদই ৯৬৩ হিজরীতে শাহ্ নূর বাবার নিকট পুনরায় পাঠিয়ে দিলেন। এটা পাওয়া মাত্র উপরের দিকে নজর উঠিয়ে শাহ্ নূর বাবা বললেন, হু বেঈমান, গাউসে পাকের হুকুমও রদ হবার নয়। যাও ইহাই হুমায়নের শেষ পরীক্ষা। হুমায়ন রাজ্য পেলো বটে কিন্তু ভোগ করা নসিব হলো না-হঠাৎ মৃত্যু হলো।

হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর অলৌকিক কেরামত ও বুজুর্গি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শাহ্ নূর বাবার দোয়ায় রাজা জমিদার সিদ্ধ মনসকাম হয়ে সময় সময় স্থানে স্থানে বহু নিস্কর মদতখাস সম্পত্তি (বিশেষভাবে প্রদত্ত সম্পত্তি বিশেষ) দান করায় প্রায় বারোশত বিঘা জমি আয়মা (জমি আয়মা বলতে সাধারণত ধর্মপ্রচারক বা পণ্ডিতদের দেওয়া নিষ্কর বা করমুক্ত জমিকে বোঝানো হতো) হয়েছিল। হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) ২৭ রজব ৯৭৫ হিজরী (১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) ওফাত লাভ করেন। হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর মাধ্যমেই বাংলাদেশের বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, বৃহত্তর দক্ষিণবঙ্গ, ভারতের মালদাহ, শিলিগুড়ি, নদীয়াসহ বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মাঝে ইসলামের প্রচার ও প্রসার লাভ করে।

উল্লেখ্য হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) ও হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর মাজার শরীফ একই সাথে বর্তমান রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া থানার অন্তর্গত দরগাহ্ পাড়ায় অবস্থিত।

১০৪৫ হিজরীতে পারস্যরাজার পক্ষে জিয়ারতের জন্য সৈন্যাধ্যক্ষ মীর্জা আলী কুলী বেগ মাজারে উপস্থিত হয়ে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) ও হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর কবরের উপর গম্বুজ ঘর প্রস্তুত করে দেন এবং শিলালিপি স্থাপন করেন। মখদুম প্রেমে পাগল হয়ে হযরত মীর্জা আলী কুলী বেগ (রহ.) দেশে না ফিরে গিয়ে এখানেই খেদমতের আনজাম দিতে থাকেন এবং কামালিয়াত হাসিল করেন। তাঁর মাজার শরীফ কমরপুর, গোদাগাড়ী, রাজশাহীতে অবস্থিত ।

অনেকেই বাবা মখদুমের মাজারের খেদমত করে অসাধারণ বুজুর্গি হাসিল করেছেন। যেমন রেশমের বড় কুঠির পর্তুগীজ দেওয়ান সৈন্যাধ্যক্ষ মুনশী জাওয়াদুল হক। তাঁর মাজার শরীফ শুর্শা, বারই পাড়া, পবা, রাজশাহীতে অবস্থিত।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বাবা মখদুম (রহ.) মহাকাল গড় (রাজশাহী)’র বিজয় অর্জন করে তাঁর শিষ্যদের রাজশাহীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে মখদুম বাবার শিষ্য হযরত সুলতান শাহ্ (রহ.) গোদাগাড়ী থানার সুলতানগঞ্জ গ্রামে, অপর শিষ্য হযরত দিলাল বুখারী (রহ.) বাঘা থানার আলাইপুরে, অপর শিষ্য হযরত করম আলী শাহ্ (রহ.) পুঠিয়া থানার বিড়াল দহ গ্রামে খানকা স্থাপন ও ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তীতে মখদুম বাবা বাঘার মখদুম নগরের খানকার দায়িত্ব অপর শিষ্য হযরত আব্বাস (রহ.) কে বুঝিয়ে দিয়ে মহাকালগড়ে (রাজশাহী) আসেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।

দিল্লীর বাদশাহ আওরঙ্গজেবের লস্করবহর নদীপথে যাবার সময় মাজার শরীফ দর্শন ও রসদ সংগ্রহার্থে জাহাজ এই নদী ঘাটে নোঙর করেন। বাদশাহ-র লস্করদার মহা সমারোহে মখদুম আস্তানা জিয়ারত ও হাজৎ নেয়াজ উপস্থিত করেন। পরবর্তীতে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১০৭৬ হিজরীর ২২শে সাওয়াল (১৬৬৫-১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে ফার্সি ভাষায় যে জীবনী গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল তারই বাংলা অনুবাদ “হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর জীবনেতিহাস” নামক এই গ্রন্থটি যেখানে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) ও হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর অনেক অজানা ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক কারামতের ঘটনা বর্ণিত আছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্যার “হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর জীবনেতিহাস” গ্রন্থটিকে “বাংলা সাহ্যিতের প্রাচীনতম গদ্যগ্রন্থ ও রাজশাহীর ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। বইটির সম্পাদনা করেন প্রফেসর মুহম্মদ আবূ তালিব। অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, ট্রাস্টের অনুমতি ক্রমে “হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) এঁর জীবনেতিহাস” নামক বাংলা সাহ্যিতের প্রাচীনতম এই গদ্যগ্রন্থটি পুনরায় প্রকাশ করছে “দি মখদুম ফাউন্ডেশন” -নিবন্ধন নম্বর: রাজশা-১২০৭/২০২৫।

প্রতি বছর যথারীতি ২৬, ২৭ ও ২৮ রজব হযরত সৈয়্যদ শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ.) ও হযরত সৈয়্যদ শাহ্ নূর (রহ.) এঁর ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয় (মূল অনুষ্ঠান ২৭ রজব)।